শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রিং সাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে উত্তোলন করা অর্থ ব্যবহারের জন্য আবেদন বাতিল করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ফলে আটকে গেল কোম্পানির আইপিও তহবিলের অর্থ ছাড়। শেয়ারহোল্ডারদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সম্প্রতি এক কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, রিং সাইন টেক্সটাইলসের আইপিও তহবিলের ১০ লাখ মার্কিন ডলার তাৎক্ষণিক অবমুক্তি এবং পরবর্তীতে অবশিষ্ট আইপিও তহবিল অবমুক্তির বিষয়ে চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট ডিভিশন থেকে একটি কার্যপত্র উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আলোচনায় উঠে আসে, কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার খাত ও সময় সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এ ধরনের সংশোধনের ক্ষেত্রে আইপিও সম্মতিপত্রে উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ী অন্তত ৫১ শতাংশ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের অনুমোদন গ্রহণ করা আবশ্যক। তবে রিং সাইন টেক্সটাইলস শেয়ারহোল্ডারদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এরই ধরাবাহিকতায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রয়োজনীয় শেয়ারহোল্ডার অনুমোদন না থাকায় কোম্পানির আইপিও তহবিল অবমুক্তির আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেডের আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের অবমুক্তির আবেদন বাতিল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিএসইসি’র এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট খাত ও উদ্দেশ্যের কথা বিবেচনা করেই আইপিওতে বিনিয়োগ করেন। পরবর্তীতে শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি ছাড়া সেই খাত বা সময় পরিবর্তন করলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তারা আরও বলেন, আইপিও তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম বা শর্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেডের ক্ষেত্রে কমিশনের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্যান্য কোম্পানির জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। এর আগেও গত বছরের ২০ জুলাই রিং সাইন টেক্সটাইলসের আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহীত অর্থের ব্যবহার করতে দেওয়ার আবেদন বাতিল করে দেয় কমিশন।
জানা গেছে, রিং সাইন টেক্সটাইল প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ১০টাকা মূল্যের ২৭ কোটি ৫১ লাখ ৪ হাজার ৮২০টি শেয়ার ইস্যু করে মোটি ২৭৫ কোটি ১০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে। কোম্পানিটি তার পরিশোধিত মূলধন ৯.৯৫ কোটি টাকা হতে ২৮৫.০৫ কোটি টাকায় উন্নীত করে। পরবর্তীতে অর্থ জমা ছাড়া প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু বা বরাদ্দের মাধ্যমে ২৭৫ কোটি টাকার মূলধন বৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট সংঘবদ্ধ আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠে এবং এ বিষয়ে তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন আইনি প্রক্রিয়ায় শুনানি শেষে রিং শাইন টেক্সটাইলের প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আইপিও প্রসপেক্টাসে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য সরবরাহ করার কারণে রিং সাইন টেক্সটাইলসের উদ্যোক্তা, তৎকালীন পরিচালকগণ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালকসহ ৯ জন এবং কোম্পানিটির তৎকালীন সিএফও ও কোম্পানি সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক সংঘটিত প্রি-আইপিও প্লেসমেন্ট সংক্রান্ত সংঘবদ্ধ আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ইস্যু ম্যানেজারের পরিবর্তে আব্দুল কাদের ফারুকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে সংঘটিত রিং শাইন টেক্সটাইলসের শেয়ার প্লেসমেন্ট সংক্রান্ত দুর্নীতির প্রেক্ষিতে তৎকালীন পরিচালকবৃন্দ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিবের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও বিষয়টি দুদকে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড উক্ত উদ্যোক্তা বা তৎকালীন পরিচালকগণ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, সিএফও, কোম্পানি সচিব সহ সংশ্লিষ্ট আব্দুল কাদের ফারুক ও অশোক কুমার চিরিমারসহ (ভারতীয় নাগরিক) মোট ১৩ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেডের ২০১৫ থেকে ২০২০ হিসাব বছর পর্যন্ত মিথ্যা ও বানোয়াট আর্থিক বিবরণী প্রত্যয়ন করায় সংশ্লিষ্ট ৪টি নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান (আহমেদ ও আখতার, সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং, মাহফেল হক অ্যান্ড কোং এবং এটিএ খান অ্যান্ড কোং) এবং তাদের পার্টনারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফাইন্যন্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) অভিযোগ দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
৪. রিং সাইন টেক্সটাইলসের বহিরাগত প্লেসমেন্টহোল্ডারগণ, যারা কোম্পানির হিসাবে অর্থ জমা না দিয়ে অথবা আংশিক জমা দিয়ে তাদের নামে শেয়ার বরাদ্দ নেয়ার মাধ্যমে অর্থ আত্বসাৎ করেছেন, এমন প্লেসমেন্টহোল্ডারদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি দুদকে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৫. রিং সাইন টেক্সটাইলসের শেয়ার প্লেসমেন্ট সংক্রান্ত যে দুর্নীতি সংগঠিত হয়েছিল, তার মূলহোতা হিসাবে দায়ী আব্দুল কাদের ফারুক এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট হিসাবে অশোক কুমার চিরিমারের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি দুদকে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শেয়ারাবাজারে রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড তারিকাভুক্ত হয় ২০১৯ সালে। বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগিরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি ৩১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

