দেশের কিংবদন্তি শিল্পী, পপ সম্রাট আজম খান আমাদের মাঝে নেই অনেকদিনই হলো। কিন্তু তার রেখে যাওয়া কৃতিত্ব ও গানগুলো এখনও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে দেশবাসীর মনে। গান দিয়ে যেমন শ্রোতাদের মাতিয়ে রেখেছেন যুগের পর যুগ, তেমনি স্বাধীনতা যুদ্ধেও তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। আজ (২৮ ফেব্রুয়ারি) তার জন্মবার্ষিকী; বেঁচে থাকলে এই কিংবদন্তি পা রাখতেন ৭৬-এ।
আজম খানের আনুষ্ঠানিক নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। কিন্তু তার পরিচিতি ‘আজম খান’ হিসেবেই। প্রায় ১৮ বছর আগে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়- আপনি আজম খান হয়ে উঠলেন কীভাবে? সেই সাক্ষাৎকারে শিল্পী বলেছিলেন, আসলে আমার ডাক নাম আজম, তাই আজম খান আরকি।
আজম খান শুধু গান নিয়েই ব্যস্ত থাকেননি; স্বাধীনতা যুদ্ধে ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ভূমিকায়; অস্ত্র হাতে লড়েছেন স্বাধীনতা অর্জনে। এ নিয়ে কিংবদন্তির পেছনের গল্প বেশ লম্বা। জানিয়েছিলেন, বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন; আর মনে ভয়ে দাগ কাটতো- বাবা জানলে হয়তো মারবেন! তার বাবা যখন জানতে পারেন, অনুমতি দেন এক শর্তে।
আজম খান এক সাক্ষাৎকারে তুলেছিলেন সেই কথা। বলেছিলেন, আমার বাবা চুপ থাকার পর বলেছিলেন, যুদ্ধে যাবি, তবে তোকে কিন্তু দেশ স্বাধীন করেই ঘরে ফিরতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাহাড়ি অঞ্চলে ক্যাম্পিং করেছিলেন এই শিল্পী। জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পেও কাজের ফাঁকে চলতো তার গানের চর্চা; গাইতেন নতুন নতুন গান। বাসন, চামচ দিয়েই চালাতেন বাদ্যযন্ত্রের কাজ। এরপর দেশ স্বাধীন হলে পুরোদমে গানের কাজে ফিরে আসেন এই কিংবদন্তি।
আজম খানের স্বপ্ন ছিল, গানের মাধ্যমে তারুণ্যের স্পিরিট আনতে, আধুনিক করে গড়ে তোলার। ছোটবেলা থেকেই শুনতেন বিদেশি শিল্পীদের গান। তার পছন্দের তালিকায় ছিল, ভারতের মান্না দে, হেমন্ত, কিশোর কুমার; আবার বিটেলস, শ্যাডোজ, রোলিং স্টোনের গানগুলো। ক্লাস নাইনের ছাত্র হয়ে তখন এসব গান শুনে শুনে নিজে থেকেই চর্চা শুরু করেন; নেন নি কোনো আলাদা গানের তালিম।
আজম খান বলেছিলেন, একদিন মনে হলো এই গানগুলো আমি বাংলায় করব, আমাদের দেশে যত ছেলেমেয়েরা আছে, তাদের মধ্যে একটা ইয়াং স্পিরিট আসবে। তারা একটু আধুনিক হবে; এ ধরনের চিন্তা ছিল আমার।
১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আজম খানের জন্ম। মারণ রোগ ক্যানসারের সঙ্গে লড়ে হেরে যান তিনি; ২০১১ সালের ৫ জুন দেশবাসীকে কাঁদিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। এখন তিনি সশরীরে না থাকলেও তার গানগুলো অমর করে রেখেছে এই কিংবদন্তিকে।
উল্লেখ্য, বঞ্চিত মানুষের গান করেন আজম খান। তার গানে রয়েছে সচেতনতা, দেশপ্রেম, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়, তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণ। গেয়েছিলেন ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘অভিমানী’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘আমি যারে চাইরে’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও রে সালেকা ও রে মালেকা’, ‘জীবনে কিছু পাব না রে’, ‘বাধা দিয়ো না’সহ অনেক জনপ্রিয় গান।

