রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যের আমদানি আগের তুলনায় বেশি হলেও বাজারে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়তে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি চিনি, ছোলা ও ডালের দামও বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দর ধর্মঘটের কারণে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া এবং নির্বাচনের ছুটিতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও চাহিদার তুলনায় পণ্যের মজুদ বেশি রয়েছে বলে জানান তারা।
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা ও খেজুর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শুধু রমজান মাসে সয়াবিন তেলের চাহিদা ৩ লাখ টন। এছাড়া চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন, পেঁয়াজ ৫ লাখ টন, ছোলা ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টন এবং খেজুরের চাহিদা ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ৪৭ হাজার টন খেজুর, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, প্রায় ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ১৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের বছরের তুলনায় এসব পণ্য এবার প্রায় দ্বিগুণ আমদানি হয়েছে। এমনকি ছোলা চাহিদার চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, চকবাজার, মৌলভীবাজার এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধরনভেদে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হলেও দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা যেসব খেজুর বেশি কেনেন, সেগুলোর দাম বেড়েছে।
বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে বস্তা খেজুর, কেজি ২২০ টাকা। জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা এবং দাবাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব খেজুরের পাইকারি দাম কেজিতে অন্তত ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে।
অন্যান্য খেজুরের মধ্যে বড়ই ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব খেজুরের দামও কিছুটা বেড়েছে।
এ বিষয়ে কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা খেজুর বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, ‘হঠাৎ করে জাহিদি খেজুর ১০ কেজির প্যাকেটে ৬০০ টাকা বেড়েছে। দাবাসে বেড়েছে ৪০০ টাকা। বন্দরে খেজুর আটকে ছিল, এ কারণে সরবরাহ কমে গেছে।’
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, ‘জাহেদি খেজুর চাহিদার তুলনায় বাজারে সংকট রয়েছে। কিছুদিন আগে যে জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল, সেখানে কিছু খেজুর ছিল। এছাড়া শুল্ক কমার আশায় দেশীয় আমদানিকারকেরা অনেক দিন আমদানি করেননি। ফলে চাহিদা অনুযায়ী খেজুর আমদানি সম্ভব হয়নি। তবে বাজারে সামগ্রিক সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।’
এদিকে, সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে পেঁয়াজ কেজিতে ১০ টাকা, চিনি ৮ থেকে ১০ টাকা, খেসারির ডাল ১০ টাকা, রসুন ২০ টাকা এবং ছোলা মানভেদে ৪ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে চিনি কেজি ১০০ টাকা, পেঁয়াজ ৬০ টাকা, দেশি রসুন ১২০ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা এবং ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে ছোলা, মটর ও খেজুরসহ রমজানসংশ্লিষ্ট পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। বিশেষ করে ছোলার বাজারে আমদানির আধিক্য থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার দাম অনেকটাই কম।’
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনের ডামাডোলে বাজার মনিটরিং কিছুটা শিথিল ছিল। এর সুযোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘প্রশাসনের বাজার মনিটরিং বা পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মূলত ক্ষমতার এই ট্রানজিট পিরিয়ডে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। এতে সাধারণ ক্রেতারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।’
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, রমজানের পণ্য কিনতে দোকানে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। নির্বাচন উপলক্ষে বাজার অনেকটাই ক্রেতাশূন্য ছিল। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের চাপ একসঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। ক্রেতারা খেজুরসহ অন্যান্য পণ্য কিনছেন।
কারওয়ান বাজারে খেজুরের দোকানে ক্রেতা আহমেদ উল্লা বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে নয়, আমি নিয়মিত খেজুর কিনি। কিন্তু এখন কেজিতে ৬০ টাকা বেড়েছে। ভোট দিতে বাড়ি গিয়েছিলাম। তাই আজ একসঙ্গে রমজানের বাজার করতে এসেছি।’