“৪ কোটি দরিদ্রের রঙিন ব্যালট পেপার, হায়রে বাংলাদেশ”— এই একটি বাক্য বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার এক করুণ ও তীক্ষ্ণ প্রতিচ্ছবি। একদিকে, দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী যখন দারিদ্র্যের সঙ্গে নিত্য সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ হচ্ছে এমন সব আয়োজনে, যা হয়তো আবশ্যকীয় নয়। এই বৈপরীত্যটি দেশের নীতি-নির্ধারণী অগ্রাধিকার এবং সম্পদের বণ্টনে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় চার কোটিরও বেশি মানুষ হয়তো চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, অথবা সামান্য একটি ধাক্কাতেই (যেমন রোগ, বন্যা, বা মুদ্রাস্ফীতি) দারিদ্র্যের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই মানুষগুলোর কাছে রঙিন ব্যালট পেপার বা জাঁকজমকপূর্ণ নির্বাচনী আয়োজন কোনো গুরুত্ব বহন করে না। তাদের জীবনের প্রধান ও একমাত্র এজেন্ডা হলো: খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সন্তানের শিক্ষা। যখন একটি পরিবারকে দিনের পর দিন ঠিকমতো দু’বেলা খাবার জোটাতে হিমশিম খেতে হয়, তখন নির্বাচনের প্রতীক বা ব্যালট পেপারের রঙ নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকার কথা নয়। তাদের চোখে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ের প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামাজিক নিরাপত্তা জালকে শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং মৌলিক সেবার মান উন্নত করা।
“রঙিন ব্যালট পেপার” শব্দগুচ্ছটি এখানে নিছক একটি কাগজকে বোঝায় না; এটি নির্দেশ করে একটি অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুলতা এবং নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের অভাব।
সাধারণত সাদা বা সাদামাটা ব্যালট পেপারেই নির্বাচন সম্পন্ন করা যায় এবং বিশ্বের বহু দেশে তাই করা হয়। রঙিন ব্যালট পেপার ব্যবহার করা মানেই হলো ছাপার খরচ, কাগজের খরচ এবং লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়া। যে অতিরিক্ত অর্থ এই রঙের পিছনে ব্যয় হয়, সেই অর্থ দিয়ে সহজেই কয়েক হাজার দরিদ্র পরিবারকে অন্তত এক মাসের খাদ্য সহায়তা বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব হতো।
এই ধরনের বিলাসিতা জনগণকে এই বার্তা দেয় যে, রাষ্ট্রের কাছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলাটা, দারিদ্র্য দূরীকরণ বা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার চেয়ে বেশি জরুরি। এটি একটি প্রতীকী বিচ্যুতি, যা সরকারের সংবেদনশীলতার অভাবকেও ফুটিয়ে তোলে।
অনেকের মতে রঙ্গীন ব্যালট পেপারে যে বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে, তার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যেকার ফারাক।
রাজনৈতিক অগ্রাধিকার: রাজনীতিবিদ ও নির্বাচন পরিচালনাকারীরা নির্বাচনকে নিখুঁত, জাঁকজমকপূর্ণ এবং প্রশ্নাতীত প্রমাণ করার জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে দ্বিধা করেন না। হয়তো এর পেছনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার যুক্তি থাকে, তবে বাস্তবতা হলো এটি সম্পদের অপচয়কে নির্দেশ করে।
অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার: দেশের উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা বারবার বলেছেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করাই দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির একমাত্র পথ। কিন্তু নির্বাচনী আয়োজনের চাপে সেই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে।
এই বৈপরীত্যের ফলস্বরূপ, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং ধনীদের সঙ্গে তাদের ব্যবধান আরও বাড়ে।
“৪ কোটি দরিদ্রের রঙিন ব্যালট পেপার, হায়রে বাংলাদেশ” বাক্যটি কোনো অভিযোগ নয়, এটি নীতি-নির্ধারকদের কাছে একটি জোরালো প্রশ্ন যে, রাষ্ট্রের সম্পদের যথার্থ ব্যবহার কোথায় হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অনস্বীকার্য, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াকে ব্যয়বহুল বিলাসিতার মোড়কে সাজানোর চেয়ে, সেই অর্থ দিয়ে চার কোটি দরিদ্র মানুষের জীবনের রঙ ফিরিয়ে আনাটা কি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?
বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যেতে হলে, রাষ্ট্রের সব আয়োজন এবং অর্থ ব্যয়কে অবশ্যই জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাজাতে হবে।