নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
রাষ্ট্রীয় নির্দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ‘ক্রসফায়ার’ এবং গুমকে যেমন দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও জনগণ অবৈধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে রায় দিয়েছে, ঠিক তেমনি পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি হরণের উদ্দেশ্যে তৈরি করা ‘মার্জিন ঋণ বিধিমালা-২০২৫’ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না— সেই প্রশ্ন এখন বিনিয়োগকারীদের মুখে মুখে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সেখানে আইনের দোহাই দিয়ে পুঁজি লুণ্ঠন কি রাষ্ট্রীয় অপরাধ নয়?
ক্ষমতার অপব্যবহার: গুম বনাম শেয়ার লুণ্ঠন
বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের ক্রসফায়ার বা গুম ছিল ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার, যা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন বা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে ব্যবহৃত হতো। জনগণ সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে যে নতুন মার্জিন নীতিমালা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাকে বিনিয়োগকারীরা ‘অর্থনৈতিক ক্রসফায়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, “ক্রসফায়ারে যেমন বিনাবিচারে মানুষ হত্যা করা হতো, তেমনি এই কালো আইনের মাধ্যমে ফোর্সড সেল (Forced Sale) বা বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির নির্দেশ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সত্তাকে হত্যা করা হচ্ছে।”
‘মার্জিন ঋণ বিধিমালা-২০২৫’: আইন নাকি ফাঁদ?
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি আইন তখনই বৈধতা পায় যখন তা জনকল্যাণে বা বৃহত্তর স্বার্থে প্রণীত হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের এই মার্জিন ঋণ নীতিমালায় বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার পরিবর্তে তাদের কোণঠাসা করার সুগভীর ষড়যন্ত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এই বিধিমালার কয়েকটি দিককে ‘অমানবিক’ ও ‘লুণ্ঠনমূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে:
১. ফোর্সড সেলের ভীতি: বাজারের পতন মুহূর্তে যখন বিনিয়োগকারীর পাশে দাঁড়ানো উচিত, তখন এই আইনের মাধ্যমে তাদের শেয়ার জোরপূর্বক বিক্রি করে নিঃস্ব করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
২. সম্পদ লুণ্ঠনের ষড়যন্ত্র: বড় রাঘববোয়াল বা সিন্ডিকেট যাতে পানির দরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হাতিয়ে নিতে পারে, সেই পথ সুগম করতেই এই বিধিমালা—এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
৩. অসাংবিধানিক: সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তির সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই সম্পত্তি (শেয়ার) কেড়ে নেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্থ করা সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন।
বিনিয়োগকারীদের দাবি ও ক্ষোভ – মতিঝিল পাড়ায় বিক্ষুব্ধ এক বিনিয়োগকারী বলেন, “রাষ্ট্রের নির্দেশে যদি গুম-খুন অবৈধ হয়, তবে রাষ্ট্রের নির্দেশে আমার জমানো পুঁজি কেড়ে নেওয়া কেন বৈধ হবে? ক্রসফায়ার যেমন ক্ষমতার অপব্যবহার, আমাদের শেয়ার জোর করে বিক্রি করে দেওয়াও একই রকম ক্ষমতার দাপট। আমরা এই কালো আইন মানি না।”
আইনজ্ঞদের মতে, যে বিধিমালা বা আইন ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’ বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী, তা কখনোই বৈধ হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে বলি দেয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় অপরাধের শামিল।
জনগণ যেমন অতীতে রাষ্ট্রীয় মদদে সংঘটিত গুম ও খুনের বিচার চেয়েছে, তেমনি পুঁজিবাজারের এই ‘অর্থনৈতিক গণহত্যা’র বিচারও সময়ের দাবি। বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট কথা—যে আইন বিনিয়োগকারীকে সুরক্ষা দেয় না বরং লুণ্ঠনকারীর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আবারও রাজপথে বিস্ফোরিত হতে পারে।

