পুঁজিবাজারে খাদ্য ও আনুসঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফাইন ফুডস লিমিটেডের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে দেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক সিটি ব্যাংকসহ আট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এরই ধরাবাহিকতায় ছয় ব্যক্তি ও সিটি ব্যাংকসহ আরেক প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করে কারসাজির মাধ্যমে ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি অভিযুক্তদের জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
জানা গেছে, ফাইন ফুডস লিমিটেডের শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগে ব্যক্তিদের মধ্যে অভিজিত দাসকে ৫৮ লাখ টাকা, মো. সানোয়ার খানকে ২৫ লাখ টাকা, মোসাম্মত আসমাউল হুসনাকে ৯ লাখ টাকা, মো. আনোয়ার পারভেজ খানকে ২ লাখ টাকা, ফাইন ফুডসের পরিচালক সালাউদ্দিন হয়দারকে ১ লাখ টাকা জারিমানা করা হয়েছে। আর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি ব্যাংক পিএলসিকে ৪২ লাখ টাকা ও এসএসএস হোল্ডিংস লিমিটেডকে ১৭ লাখ টাকা জারিমানা করা হয়েছে।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে সিটি ব্যাংক পিএলসির সম্পৃক্ততা এবং বড় অংকের আর্থিক জরিমানাই শেয়ার কারসাজির গভীরতা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম শেয়ার কারসাজির ঘটনায় উঠে আসা বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য বলছে, পুঁজিবাজারে গত বছরের শেষের দিকে গুঞ্জন ছিল ফাইন ফুডসের শেয়ার নিয়ে কারসাজি চলছে। কোম্পানির ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থার উন্নতির কারণে নয়, বরং কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়েছে। অবশেষে তদন্ত সাপেক্ষে কোম্পানির শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় এনেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
গত সরকারের আমলে আইন লঙ্ঘন করা শেয়ার কারসাজির বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন যেকোনো ধরনের কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজির আলোচিত কোম্পানি ফাইন ফুডস। ব্যবসায়িক পারফরমেন্স ভালো না হলেও শেয়ারদর আকাশ চুম্বি। এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ শেয়ার দর নিয়ে কারসাজির জন্য কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে আসছে।
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প মূলধনী কোম্পানি ফাইন ফুডসের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শেয়ারটিকে ২২৫ টাকার উপরে তুলে আনা হয়েছে। যার সঙ্গে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগসাজোশ রয়েছে। তারা শেয়ারটি নিয়ে কারসাজিতে সহযোগিতা করতে কৃত্রিম আর্থিক হিসাবসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম কারসাজি করে বাড়িয়ে তোলা হয়। পরে সুবিধামতো সময়ে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা হাতিয়ে নেয় কারসাজি চক্র। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফাইন ফুডসের শেয়ারের দাম ছিল ১৫২.৫০ টাকা। আর ২২ ডিসেম্বর কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২২৮ টাকায়। ফলে দুই মাসের ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ারের দাম কারসাজির মাধ্যমে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫.৫০ টাকা বা ৪৯.৫১ শতাংশ।
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজি করে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(২) ও সেকশন ১৭(ই)(৫) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিস্টিং রেগুলেশনস, ২০২৫ এর রেগুলেশন ৩৪(১) ভঙের দায়ে বিনিয়োগকারী অভিজিত দাসকে ৫৮ লাখ টাকা, মো. সানোয়ার খানকে ২৫ লাখ টাকা, মোসাম্মত আসমাউল হুসনাকে ৯ লাখ টাকা, মো. আনোয়ার পারভেজ খানকে ২ লাখ টাকা, ফাইন ফুডসের পরিচালক সালাউদ্দিন হয়দারকে ১ লাখ টাকা, সিটি ব্যাংক লিমিটেডকে ৪১ লাখ টাকা ও এসএসএস হোল্ডিংস লিমিটেডকে ১৭ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এ বিষয়ে বিএসইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
ফাইন ফুডস লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০০২ সালে। ‘এ’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১৩ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সে হিসাবে কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৮টি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ১৩.৯২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২২.২৬ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬৩.৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ১৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২৫) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ৩১৪.৫২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ২.৫৭ টাকা। আগের হিসাববছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ০.৬২ টাকা। সে হিসেবে শেয়ারপ্রতি মুনাফা বেড়েছে ১.৯৫ টাকা বা ৩১৪.৫২ শতাংশ। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৭.২২ টাকা।
এ বিষয়ে কথা বলতে সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে ব্যাংকটির কোম্পানি সচিব মো. কাফি খান ফোন ধরলেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।