নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশের পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুর দশা কাটিয়ে স্থিতি ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র কাছে ৯ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও সুপারিশমালা পেশ করেছে ‘বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ’।
সংগঠনটি মনে করে, ২০১০ সালের ধস এবং পরবর্তী ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনায় বাজার আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
১. ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের দাবি
বিনিয়োগকারীরা জানতে চেয়েছেন, বিএনপির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ক্ষতিগ্রস্ত পুঁজিবাজারের স্থান কোথায়? তারা দাবি তুলেছেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার এবং ইন্স্যুরেন্স খাতের সংস্কার নিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ এবং ব্যবসায়িক খরচ (Cost of Business) কমানোর দিকনির্দেশনা চান তারা।
২. লুটপাটের অর্থ উদ্ধার ও ক্ষতিপূরণ তহবিল
বিগত সরকারগুলোর আমলে এস আলম গ্রুপ, দরবেশ গ্রুপসহ বিভিন্ন লুটেরা চক্র বাজার থেকে যে টাকা আত্মসাৎ করেছে, তা বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘ইনভেস্টর কমপেনসেশন ফান্ড’ গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসান পুষিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে মনে করে সংগঠনটি।
৩. ব্লু-চিপ ও সরকারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তি
বাজারের গভীরতা বাড়াতে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কাফকো, কর্ণফুলী গ্যাসফিল্ডের মতো লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নেসলে, ইউনিলিভার, মেটলাইফ ও এসকেএফ-এর মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
৪. নীতি-নির্ধারণী সংস্কার ও পদমর্যাদা
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি (BSEC)-এর চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমতুল্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাথে বিএসইসি চেয়ারম্যানের ক্ষমতা ও প্রটোকল সমান করার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে আর্থিক খাতে কোনো একক আধিপত্য না থাকে।
৫. সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর বাজেট অধিবেশনের সময় সকল সংসদ সদস্যের সম্পদের হিসাব বিবরণী জাতীয় সংসদে পেশ করার বিধান চালুর দাবি জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ।
৬. ব্যাংক একীভূতকরণ ও অবসায়ন স্থগিত
বর্তমানে চলমান ব্যাংক মার্জার (একীভূতকরণ) প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া ১৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সংক্রান্ত সকল সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
৭. দক্ষ ও সৎ জনবল নিয়োগ
অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং এনবিআর-এর শীর্ষ পদে সৎ ও দক্ষ (Financially Integrated Dignified Person) ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় থাকে।
সংগঠনের বার্তা:
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি কাজী মোঃ নজরুল এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাজ্জাদুল হক এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “পুঁজিবাজারকে গতিশীল না করলে দেশের অন্যান্য অর্থনৈতিক খাত রুগ্ন হয়ে পড়বে। আমরা আশা করি, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দেশে আর কোনো ‘দরবেশ’ বা ‘লুটেরা’ জন্ম নেবে না এবং পাচার হওয়া টাকা ফেরত এনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো হবে।”
উল্লেখ্য, ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারী ও ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।